ডিজিটাল ডেক্সরাজধানীর গুলশানে সাবেক এক সংসদ সদস্যের বাসায় গিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও পরে ১০ লাখ টাকা গ্রহণের ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের পাঁচ নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর জেরে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির বাইরে সারা দেশের সব কমিটির কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।
রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ। তিনি বলেন—
“নামে–বেনামে অনেক অপকর্ম সংগঠনের ব্যানার ব্যবহার করে করা হচ্ছে। কেউ কেউ রাজনৈতিক শেল্টারে গিয়ে চাঁদাবাজিতে জড়াচ্ছে, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাই কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়া সব কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করা হলো।”
গুলশান থানার মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১৭ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আবদুর রাজ্জাক ও কাজী গৌরব অপু সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় গিয়ে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। হুমকি দেন, টাকা না দিলে “গ্রেপ্তার করিয়ে দিবেন”।
ভয়ে পড়া শাম্মী আহমেদের স্বামী তাদের ১০ লাখ টাকা দিয়ে বিষয়টি আপাতত মিটিয়ে দেন। কিন্তু এরপরও তারা ক্ষান্ত হননি। শনিবার (২৬ জুলাই) আবার তারা সেই বাসায় গিয়ে চাঁদা দাবি করলে, পুলিশ খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে রাজ্জাকসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে।
১. আবদুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান (ওরফে রিয়াদ) – কেন্দ্রীয় সদস্য, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ
২. ইব্রাহিম হোসেন মুন্না – আহ্বায়ক, ঢাকাস্থ মহানগর শাখা, বৈষম্যবিরোধী
৩. মো. সাকাদাউন সিয়াম – সদস্য
৪. সাদমান সাদাব – সদস্য
৫. কাজী গৌরব অপু – সহযোগী
আদালতের নির্দেশে চারজনকে ৭ দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে।
ছাত্র সংগঠনগুলোর ব্যানার ব্যবহার করে একশ্রেণির নেতা-কর্মী চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি ও অর্থ আদায়ের পন্থা বেছে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গঠনতন্ত্র বা মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে পাশ কাটিয়ে 'সমন্বয়ক', 'আহ্বায়ক', 'যুগ্ম আহ্বায়ক' পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগ বাড়ছে।
উল্লেখ্য, গ্রেপ্তারকৃত আবদুর রাজ্জাক (রিয়াদ) ছিলেন ফেব্রুয়ারিতে গঠিত সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক। তার বিরুদ্ধে এর আগেও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগ উঠেছিল।
গ্রেপ্তারের পরদিন নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার নবীপুর গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আবদুর রাজ্জাকের পাকা বাড়ির নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। প্রতিবেশীদের দাবি—অতি অল্প সময়ে বিপুল অগ্রগতি, দামি বাইক—সবকিছুই প্রশ্ন তুলেছে তার উপার্জনের উৎস নিয়ে।
তবে রাজ্জাকের পরিবার দাবি করেছে, এসব হয়েছে অনুদান, ঋণ ও টিউশনির টাকায়। যদিও কারো পক্ষেই লিখিত প্রমাণ দেখাতে পারেননি।
সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ বলেন—
“এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সেজন্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি। কেউ আমাদের নাম ব্যবহার করে অপকর্ম করলে তা বরদাস্ত করা হবে না।”
তিনি জানান, সংগঠনটি নিজেদের কমিটি ও গঠনতন্ত্র পুনর্বিবেচনা ও শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া শুরু করবে এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়া কোনো নতুন কমিটি অনুমোদন দেবে না।
ছাত্র রাজনীতি একসময় ছিল আদর্শ ও ন্যায়ের মঞ্চ। কিন্তু আজ তার রূপ বদলে যাচ্ছে নানা দুর্বৃত্তায়নের কারণে। ‘বৈষম্যবিরোধী’ নামের আড়ালে যদি চাঁদাবাজি, প্রতারণা ও দুর্নীতি চলে, তবে সেই আন্দোলনের প্রয়োজন ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।